প্রবন্ধ
অদ্বৈতবাদ ও তার সীমাবদ্ধতা
Shyamal Samanta॥ অদ্বৈতবাদ ও তার সীমাবদ্ধতা ॥ (লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) অদ্বৈতবাদ (Advaita Vedanta) হলো ভারতীয় দর্শনের এক উচ্চতর ধারার চিন্তাধারা, যার মূল ভিত্তি “ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা, জীব ব্রহ্ম ঐক্য” এই বিখ্যাত উক্তির মধ্যে নিহিত। এই দর্শনের প্রধান প্রচারক ছিলেন শঙ্করাচার্য। অদ্বৈতবাদ মতে, এই জগত ও সকল বৈচিত্র্য একমাত্র এক সত্য সত্তারই প্রকাশ, যাকে ব্রহ্ম বলা হয়। ব্যক্তি সত্তা (জীব) ও পরম সত্তা (ব্রহ্ম) মূলত এক – এই অদ্বৈত চিন্তা জীবকে মোক্ষের পথে নিয়ে যায়। অদ্বৈতবাদ মানব জীবনের মূল সমস্যাগুলির সমাধানে গভীর দার্শনিক ভিত্তি দেয়। আত্মজ্ঞানের মাধ্যমে দুঃখের অবসান ঘটে, কারণ অদ্বৈত মতে দুঃখ অজ্ঞতার ফল। তাই জ্ঞানই মোক্ষ। এই দর্শন জগতের বহুত্বকে অজ্ঞতার ভ্রান্তি বলে বিবেচনা করে এবং একমাত্র ব্রহ্মকেই চিরন্তন ও অদ্বিতীয় বলে মানে। তবে অদ্বৈতবাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা একাধিক দার্শনিক ও ভক্তি আন্দোলনের চিন্তাবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রথমত, অদ্বৈতবাদ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আমরা জগতে সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, আমি-তুমি, জন্ম-মৃত্যু—এইসব দ্বৈততার ভাবধারা নিয়েই বসবাস করি, তাই এসবকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া অনেকের কাছে কৃত্রিম মনে হয়। দ্বিতীয়ত, এই দর্শনে ঈশ্বরপ্রীতি বা ব্যক্তিগত ভক্তির স্থান খুব সীমিত। ভক্তি আন্দোলন যেমন রামানুজ, মাধবাচার্য প্রমুখ, ব্যক্তিগত ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণের উপর জোর দিয়ে বলেন যে, জীব ও ঈশ্বরের মধ্যে চিরন্তন পার্থক্য আছে, যা অদ্বৈতবাদ অস্বীকার করে। তৃতীয়ত, অদ্বৈতবাদ অধিকাংশ সময় এক প্রকার বুদ্ধিজীবী (যারা নিজেদের আত্মজ্ঞানী বলে মনে করেন ) পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তার গভীর চিন্তাভাবনা সাধারন জনের বোধগম্যতায় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। চতুর্থত, জগতকে মিথ্যা বলা হলেও, প্রতিদিনের জীবনে তার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। ক্ষুধা, পিপাসা, জন্ম -মৃত্যু, সম্পর্ক—এসব কেবল “অজ্ঞতার সৃষ্টি” বলে বর্জন করা বাস্তব জীবন থেকে পালানোর শামিল বলে মনে হতে পারে। পঞ্চমত, এই যে জড়-জগৎ এতো ব্রহ্মেরই প্রকাশ । এই যে নদী , পাহাড়, বনজঙ্গল , সমুদ্র , বিভিন্ন প্রকার ফুল ফল, পশুপাখি , অনন্ত আকাশের নীলিমা - এই সমস্ত কিছুকে আমি আমার থেকে কিভাবে আলাদা করবো ? ভগবান তো এসব আমাদের জন্যই সৃষ্টি করেছেন আমাদের ভোগের জন্য । এসব কিছুকে ত্যাগ করেই যে ঈশ্বরের কাছে যেতে হবে আর তা না হলে মায়ায় জড়িয়ে পড়তে হবে ভেবে জগৎকে অস্বীকার করা যায় না । আমরা নিজেরাই যখন উষ্ণ রক্ত মাংস ও চামড়ার আবরণে আবদ্ধ , ব্রহ্ম ও সেই রুপ ব্রহ্মাণ্ডের আবরণে আবৃত । অর্থাৎ জগৎ মিথ্যা বা মায়া হতে পারে না অর্থাৎ দ্বৈতবাদ ছাড়া অদ্বৈতবাদের ধারণা অসম্ভব বলেই মনে হয় অনেকের কাছে । অদ্বৈতবাদের মহত্ব স্বীকার করেও বলা যায়, এর পূর্ণ উপলব্ধি গভীর অন্তর্জ্ঞান ও সাধনার দাবি রাখে। সকল মানুষের পক্ষে সেই উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তাই এই দর্শন সর্বজনীন বা সর্বপ্রযোজ্য হয়ে উঠতে পারে না। শেষ কথা, সাকার ব্রহ্ম না থাকিলে নিরাকার ব্রহ্মের ধারণা কে বা কাহারা কিরূপে করিবে ॥ -:- -:-