কথন
আচার্য শঙ্কর ও মণ্ডন মিশ্রের বিতর্ক
শ্যামল সামন্তভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক বিরল উজ্জ্বল পর্ব গাঁথা আছে — যখন এক তরুণ সন্ন্যাসী, আচার্য শঙ্কর, তার অদ্বৈতবাদের আলোক জ্বালিয়ে উত্তরে-দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়েছিলেন, এবং মুখোমুখি হয়েছিলেন এক প্রবীণ, জ্ঞানপিপাসু গৃহস্থ পণ্ডিত — মণ্ডন মিশ্রের সান্নিধ্যে , যিনি ছিলেন পুর্ব মীমাংসা দর্শনের প্রধান পথিকৃৎ। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবন ও মুক্তি উভয়ই ধর্মানুষ্ঠান ও যজ্ঞকর্মের মাধ্যমে অর্জিত হয়। অন্যদিকে আচার্য শঙ্কর ছিলেন অদ্বৈত বেদান্তের ধারক, যিনি বলতেন, “ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা, জীবে ব্রহ্ম হি ন অপরঃ” — অর্থাৎ এই জগত এক বিভ্রম, আসল সত্য একমাত্র নিরাকার ব্রহ্ম। এই দুই বিপরীত দর্শনের মুখোমুখি সংঘর্ষ তাই কেবল এক তাত্ত্বিক বিতর্ক ছিল না — এটি ছিল সত্যের এক অনুসন্ধান । বিতর্কের সূচনা :- আচার্য শঙ্কর, তপস্যার দীপ্তিতে দীপ্ত, তখন ভারত পরিক্রমায়। তিনি গিয়েছিলেন মণ্ডন মিশ্রের দ্বারস্থ, এবং আহ্বান করেছিলেন এক খোলা বিতর্কে। বিচারের ভার ছিল মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রী, উভয়া ভারতীর ওপর — যিনি নিজেও ছিলেন অতুলনীয় জ্ঞানবতী। বিতর্ক শুরু হয়। দিনের পর দিন ধরে চলে উপনিষদের বাণী, বেদান্তের ব্যাখ্যা, কাব্য ও যুক্তির অগ্নিপরীক্ষা। শঙ্করের নিরাসক্তি, স্থিতপ্রজ্ঞতা এবং অপরিসীম যুক্তিবোধ মুগ্ধ করে সবার মন। অপর পক্ষে মণ্ডল মিশ্র্রের যুক্তিও সমান হলেও তুলনামূলক কিছুটা নিষ্প্রভ । মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রী কিছুটা পক্ষপাত-দুষ্ট হয়ে জয়ী কে তা নিজমুখে ঘোষণা না করে দুজন প্রতিযোগীর গলায় একটি করে তাজা ফুলের মালা পরিয়ে দেন এবং ঘোষণা করেন - যার গলার মালা আগে শুকিয়ে যাবে- ধরে নেওয়া হবে তিনিই পরাজিত । অবশেষে সন্ধ্যার সময় দেখা গেলো মণ্ডন মিশ্রের গলার মালা শুকিয়ে যায় ।অবশেষে, মণ্ডন মিশ্র আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু শঙ্করের বিজয় তখনো পূর্ণ হয়নি। কারণ উভয়া ভারতীর চ্যালেঞ্জ :- উভয়া ভারতী তখন বলেন, “তুমি যদি মণ্ডন মিশ্রকে পরাজিত করো, তবে আমাকেও পরাজিত করতে হবে — কারণ গৃহস্থ জীবনে স্ত্রী ও স্বামীর মিলিত জ্ঞানই সম্পূর্ণ এবং আমি স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী , তাই আমাকেও তোমাকে বিতর্কে পরাজিত করতে হবে ।আমি তোমায় কামশাস্ত্র বিষয়ে প্রশ্ন করব। আমাকে কামশাস্ত্রে পরাজিত করলে তবেই তুমি বিজয়ী হবে । স্ত্রীর এই ধরণের ব্যবহারে মণ্ডন মিশ্র যথার্থ বিস্ময় প্রকাশ করলেন এবং এই ধরণের আচরণ হতে বিরত থাকতে বললেন এবং বললেন এই প্রশ্ন অপ্রত্যাশিত। এক তরুণ সন্ন্যাসী কি করে কামশাস্ত্র ব্যাখ্যা করবেন? শঙ্কর জানেন — বই পড়ে নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা দরকার। তিনি মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রীকে মাতৃ সম্বোধন করে বললেন “মা আমাকে কিছুদিন সময় দিন - আমি কামশাস্ত্র শিক্ষা লাভ করে অবশ্যই তোমার কাছে আসবো । শঙ্করের গূঢ় আত্মযাত্রা :- শঙ্কর তখন সঞ্জীবনী মন্ত্রের মাধ্যমে “পরকায় প্রবেশ” করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । তিনি তার শিষ্যদের তার দেহ রক্ষার ভার দিয়ে এক সদ্য প্রয়াত রাজার দেহে প্রবেশ করেন ।শঙ্কর কয়েক মাস রাজসুখ ও কামজীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে সেই জ্ঞান নিয়ে ফিরে এসে উভয়া ভারতীর কামশাস্ত্র বিষয়ের প্রশ্নগুলির উত্তর দেন নির্ভুল ও দার্শনিক ব্যাখ্যায়। উভয়া ভারতী বুঝতে পারেন — এই সন্ন্যাসী জ্ঞান ও সংযমের সেই উচ্চতায় পৌঁছেছেন যেখানে কামও মোক্ষের পথ। এই ঘটনার পর মণ্ডন মিশ্র আচার্য শঙ্করের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ও নতুন নাম পান: সুরেশ্বরাচার্য। তিনি পরে অদ্বৈতবাদের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে ওঠেন। এই গল্প কেবল এক বিতর্কের নয় — এটি হল কর্ম, জ্ঞান ও কাম এই তিন শক্তির নিখুঁত সমন্বয়ের প্রতীক। এটি এক চিরন্তন শিক্ষা — যে সত্য, বিনয়, সহিষ্ণুতা ও ঋষিসাহস মিলে এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব ঘটাতে পারে । এই অসাধারণ গল্প আমাদের শেখায় — আধ্যাত্মিকতা কেবল নির্জন জপ নয়, বরং জীবন, জিজ্ঞাসা, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার সম্মিলিত পথ। আচার্য শঙ্করের এই কর্ম ও জ্ঞানময় বিজয় কেবল একজন সাধুর নয়, বরং এক আদর্শ মানবের।