মূল পাতায় যান
খোলা বইয়ে ফিরুন

প্রবন্ধ

॥ রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দের মতে Cosmopolitanism অর্থাৎ 'বিশ্বনাগরিকতা' বা 'বিশ্বজনীনতা' ॥

Shyamal Samanta

॥ রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দের মতে Cosmopolitanism অর্থাৎ 'বিশ্বনাগরিকতা' বা 'বিশ্বজনীনতা' ॥ ( শ‍্যমাল সামন্ত ) Cosmopolitanism এর অর্থ এমন এক চিন্তাধারা- যেখানে সব মানুষই এক বৃহৎ মানবসমাজের অংশ, যেখানে জাতি, ধর্ম, ভাষা বা দেশভেদে তাদের মধ‍্যে কোন মৌলিক বিভেদ থাকা উচিত নয় । রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় এক ধরনের নাগরিকতা দেখা যায় , যেখানে আমাদের দেশভূমি - সেটাই আমাদের মানবভূমি । একজন Cosmopolitan ব‍্যক্তি মানেই- তিনি সংকীর্ণ জাতিয়তা বা ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকেই বড় করে দেখেন। জাতিয়তা যদি মানুষকে বিভাজিত করে তবে তা অভিশাপ। রবীন্দ্রনাথ তার জাতীয়তাবাদ প্রবন্ধে লিখেছেন " জাতীয়তা এক ধরনের সংগঠিত স্বার্থপরতা "। তার মতে, কেবল নিজের জাতি বা দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যদি মানুষ অন্য জাতির ক্ষতি করে, তবে সেটা মানবতার বিরোধী । "সাধনা" প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- " মানুষের আত্মা অসীম, সে কেবল নিজের জন্য বাঁচে না, সবার জন‍্য বাঁচে ।" তিনি বিশ্বাস করতেন, সত‍্যিকারের সাধনা হোল নিজেকে বৃহত্তর মানবসমাজের সাথে যুক্ত করা । আজকাল আমরা সবাই বলে থাকি, আমরা বিজ্ঞানের যুগে বাস করি। কিন্তু আমরা যদি বৃহত্তর ভাবে চিন্তা করি তবে বলতে পারি যে আমরা এখন Cosmopolitan age এ বাস করি । বিবেকানন্দের মতে বিশ্বনাগরিকতা হোল এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি - যেখানে মানুষ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দেশ সমস্ত সীমা অতিক্রম করে 'সর্বভূতে আত্মদর্শন করে । তিনি আমাদের উপনিষদের সেই মহান বাণীর কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন - " একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি " অর্থাৎ সত‍্য এক, জ্ঞানীরা তাকে নানা নামে প্রকাশ করেন। বিভিন্ন মানুষের সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষা বিভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মূল আত্মা এক ও অভিন্ন। এই একত্ববোধই বিশ্বনাগরিকতার ভিত্তি। সমস্ত ধর্মকে সহনশীলতার সাথে গ্রহণ করতে হবে, সেইজন‍্যই তিনি " চিকাগো ধর্মসভায় " বলেছিলেন, " We not only tolerate all religions, but we accept all religions as true." তিনি আরও বলেছিলেন, " I am proud to belong to a religion which has taught the world both tolerance and Universal acceptance." তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ' সব ধর্ম, সব জাতি, সব মানুষ একই ঈশ্বরের সন্তান' । বিবেকানন্দ বারবার ভারতের প্রাচীন বাণীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ” বসুধৈব কুটুম্বকম্ " অর্থাৎ সমস্ত পৃথিবী এক পরিবার । বিবেকানন্দের নিজের ভাষায়- ' The whole world is my homeland, and all human beings are my brothers ' . পশ্চিমের দেশগুলিতে Cosmopolitanism মূলত যুক্তি ও নৈতিকতার ধারণা থেকে উদ্ভূত, কিন্তু বিবেকানন্দের ক্ষেত্রে এটি আধ‍্যাত্মিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। সেই কারণেই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ' Each soul is potentially divine' . রবীন্দ্রনাথের Cosmopolitanism ছিল সাংস্কৃতিক, মানবিক, প্রাকৃতিক ও কিছুটা আধ‍্যাত্মিক, আর বিবেকানন্দের Cosmopolitanism ছিল পুরোপুরি আধ‍্যাত্মিক ও নৈতিক । দুজনেই কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বমানবিকতার (Cosmopolitanism) ঐক‍্যেই মিলিত হয়েছেন । সংক্ষেপে বলতে গেলে, রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন এমন এক সাংস্কৃতিক বিশ্বনাগরিকতা, যেখানে প্রেম, সংগীত, সাহিত্য ও মানবিক সম্পর্কের মাধ্যমে পৃথিবী এক পরিবারে পরিণত হবে। আর বিবেকানন্দ চেয়েছিলেন এমন এক আধ্যাত্মিক বিশ্বনাগরিকতা, যেখানে প্রতিটি মানুষের আত্মায় ঈশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি করে সবাই একে অপরের ভাই বলে অনুভব করবে । দুজনের পথ ভিন্ন হলেও গন্তব্যস্থল এক- মানবতার ঐক‍্য, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও অসীমের সঙ্গে মিলন । -:- -:- -:- -:- -:-

Facebook-এ প্রকাশ · ১৬ অক্টোবর, ২০২৫2025-10-16