প্রবন্ধ
রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা পর্ব ৫
Shyamal Samanta-: রবীন্দ্র কাব্যে আধ্যাত্মিকতা:- (পর্ব - ৫) ( লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) " বোবার ইঙ্গিত ভাষা হেন আত্মীয়ের কাছে মনে হয় অন্তরের মাঝখানে নাড়ীতে যে রক্ত বহে সেও যেন ঐ ভাষা জানে, আর কিছু শেখে নাই | মনে হয়, যেন মনে পড়ে যখন বিলীন ভাবে ছিনু ওই বিরাট জঠরে অজাত ভুবন ভ্রুণ মাঝে, লক্ষ কোটি বর্ষ ধরে ঐ তব অবিশ্রাম কলতান অন্তরে অন্তরে মুদ্রিত হইয়া গেছে | ” (( সমুদ্রের প্রতি - (সোনার তরী) )) পান্ডুলিপি পর্যালোচনায় জানা যায় কবি পুরীতে প্রথম সমুদ্র দর্শন করে এই কবিতাটি লেখেন | কবিতাটি পড়ে স্বাভাবিক ভাবেই মনে হতে পারে যে কবি সমুদ্রের সঙ্গে মানব জীবনের একটা গভীর সুদূর আত্মীয়তাকে কল্পনার দ্বারা চিত্রিত করেছেন | বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে জল থেকেই যে প্রথম প্রাণের সৃষ্টি হয়েছিল -সেই সত্যকেই কবি এই কবিতার মধ্যে ব্যক্ত করেছেন | এটাই যদি আমরা মেনে নিই তবে মনে হয় আমাদের চিন্তার মধ্যে সঙ্কীর্ণতার একটা ছোঁয়া থেকে যাবে | নিছক কল্পনা এবং উপলব্ধির মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য আছে | আমরা কল্পনা করি ক্ষণস্থায়ী আনন্দ লাভের জন্য আর যখন উপলব্ধি করি তখন চিন্তার মধ্য দিয়ে কোন জিনিষের সত্যতাকে যাচাই করে পূর্ণতা লাভ করি | তাই সমুদ্র সন্মন্ধে কবির যে উপলব্ধি তা কবির নিজের ভাষাতেই বলা যাক - “ এই পৃথিবীর সঙ্গে সমুদ্রের সঙ্গে আমাদের যে একটা বহুকালের গভীর আত্মীয়তা আছে, নির্জনে প্রকৃতির সঙ্গে মুখোমুখি করে অন্তরের মধ্যে অনুভব না করলে সে কি কিছুতেই বোঝা যায় ? পৃথিবীতে যখন মাটি ছিলনা, সমুদ্র একেবারে একলা ছিল, আমার আজকের এই চঞ্চল হৃদয় তখনকার সেই জনশূন্য জলরাশির মধ্যে অব্যক্ত ভাবে তরঙ্গিত হতে থাকতো, সমুদ্রের দিকে চেয়ে তার একতান কলধ্বনি শুনলে তা যেন বোঝা যায় | আমার অন্তর সমুদ্রও আজ একলা বসে বসে সেই রকম তরঙ্গিত হচ্ছে, তার ভিতরে ভিতরে কি একটা যেন সৃজিত হয়ে উঠছে | কত অনির্দিষ্ট আশা, অকারণ আশঙ্কা, কত রকমের সৃষ্টি,কত রকমের প্রলয়, কত স্বর্গ নরক, কত বিশ্বাস সন্দেহ, কত লোকাতীত,প্রত্যক্ষাতীত, প্রমাণাতীত অনুভব এবং অনুমান, সৌন্দর্যের অপার রহস্য, প্রেমের অতল অতৃপ্তি - মানব মনের জড়িত জটিল সহস্র রকমের অপূর্ব অপরিমেয় ব্যাপার | ” সৃষ্টির অনাদি পুরুষকে এমন সহজ ভাবে প্রকাশের যে প্রচেষ্টা তা কবির কাব্যের বা রচনার মধ্যে সরল সাবলীল হয়েও জটিল | এইখানেই কবির আধ্যাত্মিক রস-বোধ সার্থকতা লাভ করিয়াছে | ক্রমশ :