প্রবন্ধ
রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা পর্ব ৬
Shyamal Samanta-: রবীন্দ্র কাব্যে আধ্যাত্মিকতা :- ( পর্ব - ৬ ) ( লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) " যত শুনি সেই অতীত কাহিনী, প্রাচীন প্রেমের ব্যথা অতি পুরাতন বিরহ মিলন কথা অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে দেখা দেয় অবশেষে কালের তিমির রজনী ভেদিয়া তোমারি মূর্তি এসে চির স্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে , ” (( অনন্ত প্রেম - (মানসী) )) প্রেম কাব্যে রবীন্দ্র রুপকল্প যে কতখানি সফল, তা তার প্রেম পর্যায়ের সঙ্গীত ও কবিতার জনপ্রিয়তা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় | এখানে আমরা তার ভাষার বাহ্যিকপ্রয়োগকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি এবং তা থেকে আমরা নিজেদের কৈশর ও যৌবনের বাস্তব আচরণকে সেই ভাবে মেলাতে চেষ্টা করে আনন্দ পেতে চাই | তাই চিন্তার যে গভীর সত্তা কবির কবিতায় বা গানে মেশানো আছে - তা আমাদের মনের নাগালের বাইরেই থেকে যায় | 'অনন্ত প্রেম' কবিতাটি ব্যর্থ প্রেমিকের জীবনপ্রান্তে স্বান্ত্বনার বাণী হিসাবে আমাদের মনে ফুটে ওঠাই স্বাভাবিক | কিন্তু চিন্তার গভীরে দক্ষ ডুবুরীর মতো ডুব দিতে পারলে এর গভীর সত্তাটাকেও উপলব্ধি করা যায় | কবির নিজের ভাষাতেই এই কবিতার গভীর সত্তাটাকে প্রকাশ করা যাক - " আমি জানি, অনাদি কাল হইতে বিচিত্র বিস্মৃত অবস্থার মধ্য দিয়া তিনি আমাকে আমার এই বর্তমান প্রকাশের মধ্যে উপনীত করিয়াছেন, সেই বিশ্বের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অস্তিত্বধারার বৃহৎ স্মৃতি তাঁহাকে অবলম্বন করিয়া আমার অগোচরে আমার মধ্যে রহিয়াছে | সেইজন্য এই জগতের তরুলতা পশুপক্ষীর সঙ্গে এমন একটা পুরাতন ঐক্য অনুভব করতে পারি , সেইজন্য এত বড় রহস্যময় প্রকান্ড জগৎকে অনাত্মীয় ও ভীষন বলিয়া মনে হয় না |” অর্থাৎ জগৎ পরিবর্তনশীল হলেও এর মধ্যে যে একটা absolute সত্তা আছে তাকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন | এই absolute সত্তার অতীত ও বর্তমানের মধ্যে যে কোন পার্থক্য নেই তাকে বোঝানোর জন্যই কবি বলেছেন - " সেইজন্য এত বড় রহস্যময় প্রকান্ড জগৎকে অনাত্মীয় ও ভীষন বলিয়া মনে হয় না ”| হেগেলীয় পদ্ধতিতে (philosophy of Hegel, a German philosopher) জগতে পরিবর্তনের ব্যাপারটা বুঝতে গেলে এমন কোন বস্তুকে ধরে নিতে হয়, যা একই সঙ্গে, সেটি প্রথমে যা ছিল তাও বটে, আবার পরে পরিবর্তিত হয়ে যা হোল তাও বটে | তাই কোনও কিছুর অতীত সত্তা যতখানি সত্য - অপর পক্ষে তার বর্তমান সত্তা ও ঠিক ততখানি সত্য, আর এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে পরম বা Absolute সত্তা| এই রুপ দুটি সত্তার সমন্বয়কে যদি কবি প্রেম হিসাবে তার কাব্যে চিহ্নিত করেন তবে তা কি অনন্ত না হয়ে পারে | এটাই হোল কবির 'অনন্ত প্রেম' কবিতার গভীর সত্তা | 'সোনার তরী' কাব্যগ্রন্থের 'সমুদ্রের প্রতি' কবিতার মধ্যে কবি সমুদ্রের সাথে মানব জীবনের আত্মীয়তার সন্মন্ধ সৃষ্টিতত্ত্বের মাধ্যমে যেভাবে প্রকাশ করেছেন, ঠিক একই ভাবে তিনি পৃথিবী তথা প্রকৃতির সাথে মানব জীবনের নিবিড় আত্মীয়তাকে প্রকাশ করেছেন তার 'সোনার তরী' কাব্যগ্রন্থের 'বসুন্ধরা' কবিতার মধ্য দিয়ে | ক্রমশ :