প্রবন্ধ
রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা পর্ব ৭
Shyamal Samanta-: রবীন্দ্র কাব্যে আধ্যাত্মিকতা :- (পর্ব - ৭ ) ( লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) গত পর্ব দুটিতে আমরা 'সমুদ্রের প্রতি ’ ও ' অনন্ত প্রেম ’ কবিতা দুটির মধ্য দিয়ে কবি কি ভাবে অব্যক্ত ও ব্যক্ত চেতনার মধ্যে সেতু বন্ধনের চেষ্টা করিয়াছেন তাহা অনুভব করিতে চেষ্টা করিয়াছি | এখন আমরা সেই একই ভাবে তার ' সোনার তরী ’ কাব্যগ্রন্থের ' বসুন্ধরা ’ কবিতাটির মধ্য দিয়ে কবি কি ভাবে পৃথিবী তথা প্রকৃতির সাথে মানব জীবনের নিবিড় আত্মিয়তাকে প্রকাশ করেছেন তার মনন করার চেষ্টা করবো | 'বসুন্ধরা ’ কবিতাটির রচনা কালেই কবি বসুন্ধরা সন্মন্ধে তার উপলব্ধির কথা লিপিবদ্ধ করে গেছেন | কবিতাটি পাঠ করিলেই পাঠকগন বুঝতে পারবেন , কবি যে মৃন্ময়ী মাতা ধরীত্রিকে চিন্ময়ী হিসাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন - তারই নিখুঁত অভিব্যক্তি এই ’বসুন্ধরা ’ কবিতাটি | তথাপি আমি কবির উপলব্ধিকে তার নিজের ভাষায় লিপিবদ্ধ করলাম - " এ যেন এই বৃহৎ ধরণীর প্রতি একটা নাড়ীর টান | এক সময়ে যখন আমি এই পৃথিবীর সঙ্গে এক হয়েছিলুম, যখন আমার উপর সবুজ ঘাস উঠত, শরতের আলো পড়তো, সূর্যকিরণে আমার সুদূর-বিস্তৃত শ্যামল অঙ্গের প্রত্যেক রোমকূপ থেকে যৌবনের সুগন্ধি উত্তাপ উর্থ্থিত হতে থাকতো, আমি কত দূর দূরান্তর কত দেশ-দেশান্তরের জল-স্থল পর্বত ব্যপ্ত করে উজ্জ্বল আকাশের নীচে নিস্তব্ধ ভাবে শুয়ে পড়ে থাকতুম - তখন শরৎ সূর্যালোকে আমার বৃহৎ সর্বাঙ্গে যে একটা আনন্দরস, একটি জীবনিশক্তি, অত্যন্ত অব্যক্ত অর্ধচেতন এবং অত্যন্ত প্রকান্ড ভাবে সঞ্চারিত হতে থাকতো, তাই যেন খানিকটা মনে পড়ে | আমার এই যে মনের ভাব এ যেন এই প্রতিনিয়ত অঙ্কুরিত মুকুলিত পুলকিত সূর্যসনাথা আদিম পৃথিবীর ভাব | যেন আমার এই চেতনার প্রবাহ পৃথিবীর প্রত্যেক ঘাসে এবং গাছের শিকড়ে শিকড়ে শিরায় শিরায় ধীরে ধীরে প্রবাহিত হচ্ছে, সমস্ত শস্যক্ষেত্রে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠছে এবং নারকেল গাছের প্রত্যেক পাতা জীবনের আবেগে থরথর করে কাঁপছে| এই প্রথিবীর উপর আমার যে একটি আন্তরিক আত্মীয়বৎসলাতার ভাব আছে - ইচ্ছ করে সেটা ভালো করে প্রকাশ করতে - কিন্তু অনেকেই ঠিকটি বুঝতে পারবেনা, কি একটা কিম্ভুত রকমের মনে করবে | ” 'বসুন্ধরা' কবিতাটির প্রথমেই কবি লিখেছেন - " আমারে ফিরায়ে লহো অয়ি বসুন্ধরে, কোলের সন্তানে তব কোলের ভিতরে বিপুল অঞ্চলতলে | ওগো মা মৃন্ময়ী, তোমার মৃত্তিকা মাঝে ব্যাপ্ত হয়ে রই, দিগ্বিদিকে আপনারে দিই বিস্তারিয়া বসন্তের আনন্দের মতো | ……….. ” এখানে আমাদের মনে হতে পারে আমরা এই মাটিতে জন্মেছি এবং মৃত্যুর পর আবার এই মাটিতেই মিশে যাবো - এটাই কবি কাব্য করে ফুটিয়ে তুলেছেন | কিন্তু এই চিন্তা আমাদের প্রত্যক্ষ অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ | কিন্তু কিছু কিছু অনুভূতি আছে যাকে প্রত্যক্ষ করা যায় না এবং কাউকে প্রত্যক্ষ করানোও যায় না | তবে কি সেই অনুভূতি গুলি মিথ্যা ? সেই অনুভূতি- গুলিকেই উপলব্ধি বলা যেতে পারে | একজনের উপলব্ধ সত্যকে অপরের কাছে প্রকাশ করার জন্য কোন মাধ্যমই কাজ করেনা - এই জন্যই বোধ হয় 'ব্রহ্ম' কি? বা ঈশ্বর কি ? তাঁকে কেউ ব্যাখ্যা বা প্রকাশ করতে পারে না | এই জন্যই ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব বলেছেন 'ব্রহ্ম' কে কেউ উচ্ছিষ্ট করতে পারেনি | কবি যেমন এখানে মাতা বসুন্ধরাকে মৃন্ময়ী মা হিসাবে প্রকাশ করেছেন তেমনি কবি এই একই কবিতার মধ্য দিয়ে কোথাও তিনি বসুন্ধরাকে সুন্দরী প্রেয়সী বা প্রেমিকা হিসাবে ব্যক্ত করিয়া প্রকৃতির রুপ রস গন্ধ বা সমস্ত কিছু অনলস ভাবে ভোগের মাধ্যমে আনন্দ পেতে ও চেয়েছেন | ক্রমশ :