প্রবন্ধ
রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা পর্ব ১৩
Shyamal Samanta-: রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা :- (ধারাবাহিক ) (পর্ব - ১৩) ( লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) পূজা পর্যায় - (গান সংখ্যা -৩ ) " আমার যা আছে আমি সকল দিতে পারি নি তোমারে নাথ - আমার লাজ ভয়, আমার মান অপমান, সুখ দুখ ভাবনা ॥ মাঝে রয়েছে আবরণ কত শত, কতমতো - তাই কেঁদে ফিরি, তাই তোমারে না পাই, মনে থেকে যায় তাই হে মনের বেদনা ॥ যাহা রেখেছি তাহে কি সুখ - তাহে কেঁদে মরি, তাহে ভেবে মরি । তাই দিয়ে যদি তোমারে পাই কেন তা দিতে পারি না ? আমার জগতের সব তোমারে দেব, দিয়ে তোমায় নেব - বাসনা ॥ ” পূজা পর্যায়ের এই গানটি সম্পূর্ণ ভাবে একটি সমর্পনের গান, শুধুমাত্র নিজেকে নয়, আমাদের পার্থিব অপার্থিব যা কিছু সম্পদ আছে, সবকিছু ঈশ্বরের কাছে সমর্পণের আকুল আকুতি বা মিনতি । আমরা সাধারণত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি সমস্ত কিছু পাবার জন্য । যেমন সুখ দাও, সম্পত্তি দাও, আয়ু ও আরোগ্য দাও । আমরা যদি কাউকে জিজ্ঞাসা করি যে তুমি মন্দিরে যাও কেন, পূজা কর কেন ? তবে সকলেই বলবে যে তারা কোন একটা প্রার্থনা নিয়ে বা কোন একটা সামাজিক প্রথা অনুযায়ী কোন আচার, অনুষ্ঠান পালনের জন্যই পূজা করে বা মন্দিরে যায়। সংক্ষেপে আমরা পরমেশ্বরের কাছে কিছু না কিছু চাইতেই থাকি । এটাই আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি । আমরা মনে করি ঈশ্বরই একমাত্র দাতা এবং আমরা গ্রহীতা । কিন্তু আমরা কেহ ই দান-প্রতিদানের ঊর্দ্ধে গিয়ে বলতে পারি না - যে আমি পূজা করি, বা আমি মন্দিরে যাই - কারণ “আমি ঈশ্বরকে ভালোবাসি “ । সহজ কথায় আমরা মন্দিরে গিয়ে ঈশ্বরের সাথে ব্যবসা করি । তাইতো আমরা মন্দিরে গিয়ে মানত করি, মানত পূর্ণ হলে পূজা দিই । এখনকার জগতে মানুষের মনোভাবটাই এমন যে আমরা কাউকে পাঁচআনা দিয়ে ষোলআনা ফিরে পেতে চাই । যে ঈশ্বর সমস্ত কিছুর মালিক আমরা তার কাছ থেকে তার কিছু অংশ মাত্র প্রার্থনা করি নিজেদের ক্ষণিক সুখের জন্য । আমাদের মনে এটা আসে না যে আমরা আমাদের সর্বস্ব দিয়ে যদি তাঁকে চাই এবং তাঁকে পাই, তবে তো সব কিছুই পাওয়া হয়ে যায় । এই কঠিন/সহজ সত্যটাই আমরা নির্বোধ বালকের মতো বুঝতে পারিনা বা বুঝতে চাই না । তাই তো আমরা শিশুর খেলনা চাওয়ার মতো ঈশ্বরের কাছে একটা না একটা কিছু চাইতেই থাকি । “যাহা রেখেছি তাহে কি সুখ তাহে কেঁদে মরি তাহে ভেবে মরি তাই দিয়ে যদি তোমারে পাই, কেন তা দিতে পারি না ? “ গানের এই কথাগুলি এমনিতে আমাদের মনে আসে না, কিন্তু এই কথাগুলি যখন গানের মধ্যে শুনি, তখন আমাদের মনের মধ্যে একটা সাময়িক উপলব্ধি আসে । সত্যি তো আমরা যা কিছু ধরে রাখি তা নিয়ে কেবলমাত্র অমূলক অশান্তি ও দুখ ভোগ করি এবং এ ও জানি আমাদের যা কিছু আছে তা সমস্ত কিছু সমর্পন করলেই তবে তাঁকে পাবো, তথাপি সমর্পন করতে পারিনা, কিন্তু কেন ? এটাই কবির আকুল মিনতি এবং আমাদের ও । গানের কথাগুলি পড়ে নিয়ে গানটি একবার শুনবেন, গানটিকে নূতন করে আবিষ্কার করতে পারবেন । ক্রমশ :