মূল পাতায় যান
খোলা বইয়ে ফিরুন

প্রবন্ধ

রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা পর্ব ১৪

Shyamal Samanta

-: রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা :- (ধারাবাহিক)। (পর্ব - ১৪ ) ( লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) এর আগের ৩টি পর্বে আমি পূজা পর্যায়ের ৩টি গান নিয়ে আলোচনা করেছি । রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গান নিয়ে আলোচনা করা বা তার মধ্য থেকে আধ্যাত্মিক তত্ত্বের রস নিষ্কাষণ করে কাউকে বোঝান আমার উদ্দেশ্য নয় । যে যেরকম মনোভাবাপন্ন সে সেই ভাবেই এক একটি গানকে অনুভব করবে এবং বুঝবে । এটাই স্বাভাবিক । কিন্তু যাহারা রবীন্দ্র কাব্য বা সাহিত্যের যথার্থ অনুরাগী এবং আধ্যাত্মিক মনোভাবাপন্ন, তাহাদের কাছে প্রতিটি পূজা পর্যায়ের গানই এক একটি পূজার অর্ঘ্য স্বরুপ যা তাহারা শোনা মাত্রই পরমেশ্বরের কাছে নিবেদন করে থাকে এবং ভক্তি রসের মধ্যে ডুবে যায় । পূজা পর্যায়ের এক একটি গানকে শুনে আমরা যদি একটু অনুভব করতে চেষ্টা করি তবে তার দ্বারা আমরা আমাদের হৃদয় কুসুমকে বিকশিত এবং শুদ্ধ করে ক্ষণিকের জন্য হলেও তা দেবতার পায়ে অঞ্জলি দিতে পারি । এটাই যথার্থ পূজা । এখানেই পূজা পর্যায়ের গানের সার্থকতা লুকানো আছে ঠিক যেন গুপ্তধনের মতো । আমার একটি অতি প্রিয় পূজা পর্যায়ের গানের আলোচনা করে এই পর্ব শেষ করবো। গানটি হোল :- পূজা পর্যায় - (গান সংখ্যা - ৪ ) “ অল্প লইয়া থাকি, তাই মোর যাহা যায় তাহা যায় । কণাটুকু যদি হারায় তা লয়ে প্রাণ করে 'হায় হায়' ॥ নদীতটসম কেবলই বৃথাই প্রবাহ আঁকড়ি রাখিবারে চাই, একে একে বুকে আঘাত করিয়া ঢেউগুলি কোথা যায় ॥ যাহা যায় আর যাহা-কিছু থাকে সব যদি দিই সঁপিয়া তোমাকে তবে নাহি ক্ষয়, সবই জেগে রয় তব মহা মহিমায় । তোমাতে রয়েছে কত শশী ভানু, হারায় না কভু অণু পরমাণু, আমারই ক্ষুদ্র হারাধন গুলি রবে না কি তব পায় ॥ “ এটি একটি অল্পশ্রুত অর্থাৎ অতটা জনপ্রিয় গান নহে । তথাপি এই গানটি আমার প্রিয় পূজা পর্যায়ের গানের মধ্যে একটি অতি প্রিয় গান । সংসারে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে ছেলে-মেয়ে মানুষ করার সাথে সাথে আমাদের বস্তু সংগ্রহের প্রচেষ্টাই মূল হয়ে দাঁড়ায় । আমরা একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে চলে যাই - কে কতটা সম্পদ সংগ্রহ করতে পারি । এই পৃথিবীতে পরমেশ্বরের দেওয়া সম্পদের কাছে আমাদের সম্পদ অতি নগন্য । তাই হঠাৎ করে আমাদের অল্প সঞ্চয়ের গণ্ডী থেকে যদি কিছু হারিয়ে যায় তবে আমাদের মন হাহাকার করে ওঠে। গানের প্রথম লাইন দুটির মধ্যে সেইটুকুই বোঝানো হয়েছে । আমরা যা কিছু এই পৃথিবীতে ধরে রাখতে চেষ্টা করি - তা কি পারি ? সবই একদিন চলে যাবে বা হারিয়ে যাবে ঠিক যেমন নদীর তট বা কিনারা নদীর জলরাশিকে ধরে রাখতে পারে না । কবি তাই বলছেন যা আমাদের হারিয়ে গেছে, আর যা কিছু আছে সবকিছুই যদি ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করি তাহলে তো আর কোন কিছুই হারাবার ভয় থাকে না, সবকিছুই তার কাছে সঞ্চিত থাকবে। কবি এই গানের মধ্যে একটি সুন্দর তুলনা দিয়েছন - যেমন - 'তোমাতে রয়েছে কত শশী ভানু, হারায় না কভু অণু পরমাণু আমারই ক্ষুদ্র হারাধনগুলি রবে না কি তব পায়' কবি বলছেন তোমার সৃষ্ট জগতে সবকিছু নিয়মে বাঁধা,সেখানে কোটি কোটি সূর্য, গ্রহ, চাঁদ, তারা, অণু পরমাণু কোন কিছুই যখন হারায় না; তাহলে আমাদের যা কিছু হারায় - অর্থাৎ আমাদের আত্মীয-স্বজন পরিজন মৃত্যুর পর যারা হারিয়ে গেছে বলে মনে হয় , যাহাদের জন্য আমাদের মন হাহাকার করে, তারা কি তোমার কাছে থাকবেনা ? এখন গানের শ্রোতারাই অনুভব করবেন যে আধ্যত্মিক রসটা এখানে কোথায় এবং কতটা গভীর । বিজ্ঞানে "Law of conservation of Mass” অনুসারে পৃথিবীতে কোন কিছু সৃষ্টি করা যায় না আবার ধ্বংস ও করা যায় না, অর্থাৎ পৃথিবীর সৃষ্টির আগে ও পরে পৃথিবীর Mass একই আছে ও থাকবে । 'একম অদ্বিতীয়ম ব্রহ্ম' । Science এর এই তত্ত্বটিকে কবি কি সুন্দর ভাবে আধ্যাত্মিক রসের মাধ্যমে অদ্বৈতবাদকে প্রকাশ করেছেন গানের উপরোক্ত শেষ লাইন দুটির মধ্যে । এই কারণেই গানটি আমার অতি প্রিয় গান । গানটি দ্বিজেন মুখার্জি ও সুবিনয় রায়ের গলায় শোনার অনুরোধ রইলো । ক্রমশ :

Facebook-এ প্রকাশ · ২৬ জুন, ২০২২2022-06-26