প্রবন্ধ
আমার জীবনে ঈশ্বর অনুভুতি পর্ব ৪
Shyamal Samanta-:- আমার জীবনে ঈশ্বর অনুভুতি -:- (পর্ব - ৪ ) ( কলমে - শ্যামল সামন্ত ) আর একটা ছোট উপনিষদের গল্প আমি মায়ের মুখে শুনেছিলাম আমার ৭-৮ বৎসর বয়েসে যেটা আমার মনে গভীর দাগ কেটেছিল এবং আমার এখনও মনে আছে। আরও অনেক ছোট ছোট গল্প মা বলতো যেগুলোর মধ্যে একটা করে নীতি বা উপদেশ থাকতো । সে সব অনেকই আর মনে নেই । ( ২য় গল্প ) জাবাল সত্যকাম - এই গল্পটি অতি প্রাচিন কালের, যখন কোন পাঠশালা বা স্কুল ছিলনা, গুরুগৃহে গিয়ে বিদ্যালাভ করতে হোত । ব্রাহ্মন সন্তান বা উচ্চকুলজাত না হলে গুরুগৃহে বিদ্যা অর্জন করা যেত না । এক অতিব গরীব মহিলা কোনও রকমে পর্ণকুটীরে বাস করতো। তার একটি ছোট ছেলে ছিল, তার নাম সত্যকাম । একটু বড় হলে ছেলেটি একদিন তার মাকে বলিল, মা আমি গুরুগৃহে বিদ্য শিক্ষা করিতে চাই । মা কহিলেন, ঠিক আছে । কাছেই মহর্ষি গৌতমের আশ্রম । তার আশ্রমে যাবি, তিনি যদি তোকে তার আশ্রমে পড়ার অনুমতি দেন , তবে তুই বিদ্যা শিক্ষা করবি । সেইমতো একদিন সত্যকাম মহর্ষি গৌতমের আশ্রমে হাজির হলেন । প্রণাম পূর্বক সত্যকাম মহর্ষিকে তার ইচ্ছার কথা জানাইল । মহর্ষি কুশল পূর্বক সত্যকামকে তার পিতার নাম,কুল ও গোত্রাদি জিজ্ঞাসা করিলেন । সত্যকাম সে সব কিছুই জানতো না । পিত্র পরিচয় ও গোত্রাদি কিছু না জানায় আশ্রমের অপর ছাত্ররা অন্যান্য ঋষিরা হাসাহাসি করতে লাগল । কিন্তু মহর্ষি গৌতম সত্যকামকে বলিল, বৎস তুমি তোমার মায়ের কাছ হতে জেনে নিয়ে তারপর এসো। সত্যকাম কুটিরে ফিরে মাকে সমস্ত কিছু বলিল। মা শুনিয়া কিছুক্ষণের জন্য গম্ভীর হয়ে গেলেন, কারণ তিনি নিজেও জানতেন না সত্যকামের আসল পিতিৃপরিচয়। কিছুক্ষণ পরে মা সত্যকামকে বলিল , মহর্ষিকে বলবি, ' যৌবনে বহু পরিচর্যা করে মা আমাকে পেয়েছে, তাই আমার পিতিৃ পরিচয় তার অজানা, আমর মায়ের নাম জাবালা- তাই আমার পরিচয় বা আমার নাম সত্যকাম জাবাল ' । পরের দিন মহর্ষির আশ্রমে গিয়ে মায়ের কথামত সত্যকাম বিন্দুমাত্র লজ্জা, সংকোচ না করে নির্ভয়ে নিজের জন্মের বিব্রতকর ইতিহাস ঋষি গৌতমের সকল শিষ্যদের সামনে না লুকিয়ে অকপটে বলে দিলেন এবং নিজেকে সত্যকাম জাবাল বলে পরিরচয় দিলেন । তার এই অসমান্য নিঃসংকোচে সত্যকথা বলার সাহস দেখে মহর্ষি গৌতম মুগ্ধ হয়ে গেলেন । অন্যসকলে আপত্তি জানালেও মহর্ষি গৌতম বললেন , সত্যকাম ব্রাহ্মন সন্তান কি না জানিনা, তবে সে সত্যকুলজাত । এই কঠিন সত্যটা বলার মত যার সাহস আছে সে অবশ্যই ব্রাহ্মনকুলজাত । মহর্ষি গৌতম সত্যকামকে কহিল, হে বালক যাও সমিধ নিয়ে এসো, আমি তোমাকে উপনয়ন দেবো, অর্থাৎ শিষ্য হিসাবে গ্রহন করবো । পরবর্তিকালে সত্যকাম মহর্ষি গৌতমের যোগ্য শিষ্য হিসাবে ঋষি সত্যকাম জাবাল নামে পরিচিত হয়েছিলেন । পরবর্তীকালে ওনার নাম অনুসারে জাবাল উপনিষদ নামে একটি উপনিষদ রচনা করা হয়েছিল । এই গল্পটি বলার কারণ ,মা এই গল্পটি বলে আমাকে বুঝিয়েছিল, যে কোন পরিস্থিতির মধ্যেই আমরা থাকি না কেন, সত্য কথা বলতে যেন আমরা ভয় না পাই । কিছু কিছু সাধারণ শিক্ষা যেগুলো ছোটবেলা থেকে অভ্যাস না করলে বড় হয়ে সেগুলো আর শেখা যায়না, এটা আমি প্রত্যক্ষ করেছি । আধ্যাত্মিক শিক্ষার সাথে সাথে চারিত্রিক ও নৈতিক শিক্ষার বীজগুলি মা-ই আমার মধ্যে ছোটবেলায় বপন করে দিয়েছিলেন । ( ক্রমশঃ )