প্রবন্ধ
রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা পর্ব ১৫
Shyamal Samanta-: রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা :- (পর্ব - ১৫ ) (লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) ( পর্যায় - প্রেম ) আগের ৪টি পর্বে কবিগুরুর পূজা পর্যায়ের গানের মধ্যে যে আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ সে ব্যাপারে আলোচনা করেছি এবং দেখেছি কিভাবে পূজা পর্যায়ের এক একটি গানকে পূজার অর্ঘ্য রুপে ভগবানের পায়ে নিবেদন করা যায় বা রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্য দিয়েও যে পরম ব্রহ্মের অসীম সত্ত্বার একটা আভাস পাওয়া যায় সেটাই বোঝাতে চেষ্টা করিয়াছি । ঈশ্বরকে পূজা করতে করতে যখন আমরা আমাদের স্ব-রুপকে বা অরুপকে বুঝতে পারি অপরুপের আলোয়, তখনই আমাদের পূজার খেলা শেষ হয় এই পৃথিবীর খেলাঘরে । অর্থাৎ পূজার মাধ্যমে আমরা যা কিছু আবেদন বা নিবেদন করি - সে সবই তখন প্রেম হয়ে ঝড়ে পড়ে ঈশ্বরের পদতলে । কৈশর বয়েসের কিশোর কিশোরীরাই রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গানের ভক্ত বা অনুরাগী বলে পরিচিত, কারণ ভালোবাসা ও প্রেমের পার্থক্যটা তখন তাদের অজানা, তাই প্রেম বলতে তারা ভালোবাসাটাকেই বেশী করে বোঝে । তাই প্রেম পর্যায়ের গানের মাধ্যম দিয়েই তারা নিজের ভালোবাসার জনকে খুঁজতে চেষ্টা করে । রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গানের মধ্যে মানব জীবনের পার্থিব প্রেমের প্রকাশকে প্রাধান্য দিলেও কোথাও ঠিক বুড়ি ছোঁয়ার মতো করে সেই অনন্ত পুরুষের আভাস দিয়েছেন, সেটা সাধন-স্তর থেকেই অনুভব সাপেক্ষ । কৈশর বয়েসের কিশোর কিশোরীরা যখন ভালোলাগা-ভালোবাসার চেতনায় দোদুল্যমান, তারা তখন পুরোপুরি কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে । তাই তারা রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের যে কোন গানের কথাগুলিকে নিজেদের পরিস্থিতির অনুকুলে ভেবে নিয়ে একপ্রকার ভালোলাগার আনন্দ অনুভব করে, আর এখানেই কবির প্রেম পর্যায়ের গানের জনপ্রিয়তার সার্থকতা । কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা । তাই প্রেম পর্যায়ের গানগুলির মধ্যে কবি কি ভাবে আধ্যাত্মিক রসকে লুকিয়ে রেখেছেন সেটাই আমাদের জানতে হবে । তবেই আমরা যথার্থ ভাবে প্রেম পর্যায়ের গানের রসিক হয়ে উঠতে পারবো । এ কথা সত্য অবশ্যই এখানে পার্থিব প্রেমের প্রকাশ আছে, কিন্তু তার সাথে সাথে অতি সূক্ষভাবে একটা ভগবত প্রেমের সূত্রও দেওয়া আছে । পার্থিব প্রেমের প্রকাশের কারুকার্যে তিনি সেই প্রেম চেয়েছেন - যে প্রেম কাউকে দগ্ধ করে না, সমাজ ও তার পারিপার্শ্বিক বাতাবরণকে কলুষিত করে না, বরঞ্চ সকলকে আলোকিত করে । প্রেম যদি সত্য থেকে অসত্যে, জ্ঞান থেকে অজ্ঞানের পথে ধ্বাবিত হয় তবে প্রেম তখন মত্ত হয়ে বেড়ায় , তার সংযম ও ধৈর্য নষ্ট হয়, তার কল্পনা বৃত্তি উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে এবং নিজের প্রতিষ্ঠাকে নিজের হাতে নষ্ট করে । এই রকম প্রেমের প্রকাশ কিন্তু কবি চাননি । প্রেম পর্যায়ের গানগুলি শোনার সময় এই অনুভুতি গুলিকে আমাদের বুঝতে চেষ্টা করতে হবে, তবেই আমরা প্রেমের নান্দনিক ভাবটিকে নিজেদের জীবনে ফুটিয়ে তুলতে পারবো, আমাদের জীবনকে সুন্দর করতে পারবো এবং প্রেমের দ্বারা আমরা মুক্ত হতে পারবো । অর্থাৎ পার্থিব প্রেমের মধ্য দিয়ে আমাদের ঐশ্বরিক প্রেমে উন্নীত হতে হবে । গান শোনার সময় আমাদের একটা বিষয় বিশেষ খেয়াল রাখা দরকার যে ঈশ্বর জ্ঞানের চরম বিষয় নয়, তিনি উপলব্ধির সর্বোত্তম সত্য । পরের পর্বে আমরা কয়েকটি প্রেম পর্যায়ের গান নিয়ে আলোচনা করবো । ক্রমশ :