মূল পাতায় যান
খোলা বইয়ে ফিরুন

প্রবন্ধ

রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা পর্ব ৮

Shyamal Samanta

-: রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা :- ধারাবাহিক ( পর্ব - ৮ ) ( লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) " হে সুন্দরী বসুন্ধরে, তোমা-পানে চেয়ে কতবার প্রাণ মোর উঠিয়াছে গেয়ে প্রকাণ্ড উল্লাসভরে | ইচ্ছা করিয়াছে সবলে আঁকড়ি ধরি এ বক্ষের কাছে সমুদ্রমেখলা-পরা তব কটিদেশ, প্রভাতরৌদ্রের মতো অনন্ত অশেষ ব্যাপ্ত হয়ে দিকে দিকে অরণ্যে ভূধরে কম্পমান পল্লবের হিল্লোলের পরে করি নৃত্য সারাবেলা করিয়া চুম্বন প্রত্যেক কুসুমকলি, করি আলিঙ্গন সঘন কোমল শ্যাম তৃণক্ষেত্রগুলি, প্রত্যেক তরঙ্গ-পরে সারাদিন দুলি আনন্দদোলায়; ——— ” (( সোনার তরী - ( বসুন্ধরা ) )) পাঠক মাত্রই কবিতার এই অংশটি পড়ে বুঝতে পারবেন এখানে কবি মাতা বসুন্ধরাকে নিজের লীলা-সঙ্গিনী হিসাবে কল্পনা করিয়াছেন | তিনি পৃথিবীর যা কিছু সৌন্দর্য রুপ রস গন্ধ আছে সবকিছু যাহা ইন্দ্রীয়-গ্রাহ্য তাহা তিনি ভোগের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে চান | যেহেতু আমরা রবীন্দ্রকাব্যের মধ্যে আধ্যাত্মিকতার আলোচনা করবো, সেইহেতু বলে রাখি , কোনও কিছু ভোগ করা আর ভোগের মধ্য দিয়া উপলব্ধি করা এক জিনিষ নয় | তাই কবি মাতা বসুন্ধরাকে নিজের লীলা-সঙ্গিনী হিসাবে কল্পনা করিলেও তিনি তাহাকে ভোগের সামগ্রী হিসাবে কখনও কল্পনা করেননি | তিনি তাহার কাছে সশ্রদ্ধ জননী হিসাবেই পরিস্ফুট | এখানেই তাহার চাতুর্য | আমরা সাধারণ পাঠকরা তাহার এই চতুরতা ধরতে পারি না | এখানেই রবীন্দ্র সাহিত্যের অপরিমেয়তা ও অনুপম দক্ষতা | এর আগের পর্বে বলেছিলাম যে একজনের উপলব্ধ সত্যকে অপরের কাছে প্রকাশ করার জন্য কোন মাধ্যমই কাজ করেনা | সেইজন্যই 'ব্রহ্ম' কি ? সে কথা কোনও সাধক তার শিষ্যদের সম্যকভাবে তার ব্যাখ্যা দিতে পারেন না | তাই শিষ্যরা যে যেমন ধারণা করে নিতে পারে তার কাছে 'ব্রহ্ম' সেই রকম | কবি মাতা বসুন্ধরাকে কিভাবে উপলব্ধি করিয়াছেন যে তিনি চিন্ময়ী সেটা আমরা কিভাবে বুঝবো সেটা সম্পূর্ন আমাদের ব্যাপার | তিনি নানারকম ভাবে আমাদের বোঝাবার চেষ্টা করেছেন মাত্র | 'বলাকা' কাব্যগ্রন্থের পর্যালোচনায় কবি এক জায়গায় লিখেছেন - " গর্ভে যখন সন্তান থাকে সে মাকে দেখেনা, মা যখন তাকে মাটির উপর দূর করে দিল, তখন যেন সে সমাদরের বেষ্টন থেকে অসন্মানের ধরণীতে বিচ্যুত হোল | কিন্তু তখনই শিশু মা কে দেখতে পেল | ” ঠিক একই ভাবে মানুষ যখন মৃন্ময়ী মাতা ধরিত্রীর গর্ভে ভ্রুন আকারে বা অব্যক্ত অবস্থায় থাকে তখন সে মাতা ধরিত্রীকে চোখে দেখেনি, বোঝেনি, কিন্তু যখন সে জীবন রুপে ব্যক্ত হোল , তখনই সে মাতা ধরিত্রীকে দেখতে পেল | শিশু ভুমিষ্ট হয়ে যখন বুঝতে পারে যে সে মায়ের সমাদরের বেষ্টন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে তখনই সে কেঁদে ওঠে | সেইরুপ মহাশূন্যের অব্যক্ত অবস্থা থেকে মানুষ ব্যক্ত অবস্থায় উপনীত হয়ে অর্থাৎ অসীম থেকে সসীমে বিচ্ছিন্ন হয়ে, সেই অসীমের সঙ্গে পুঃণরায় মিলিত হওয়ার জন্য এক প্রকার বিরহ বেদনা অনুভব করে | মৃত্যুর পর আমাদের সসীম অবস্থা আবার অসীমের সঙ্গে মিশে যায়, অর্থাৎ আমরা আবার মাতা ধরিত্রীর অসীম ক্রোড়ে স্থান পাই | নিজ মায়ের গর্ভের সাথে মাতা বসুন্ধরার গর্ভের তুলনা করে যেভাবে তিনি ব্রহ্মের অব্যক্ত অবস্থা থেকে ব্যক্ত হওয়াকে ব্যাখ্যা করেছেন তা অতি অতুলনীয় | এই ধরনের চিন্তা-প্রসুত বলেই রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতার একটা স্বতন্ত্র মূল্যবোধ আছে | মাতা বসুন্ধরার অসীম অঙ্গের মধ্যে অসীম কক্ষ, এবং প্রতিটি কক্ষের মধ্যে রুপ রস গন্ধ ও অসংখ্য মায়ার, প্রলোভনের খেলা চলছে | আমরা সাধারণ জীব এক একটি খেলাঘরে ভুলে আছি | কবি কিন্তু এমন একটি ঘরের খোঁজ করছেন যেখানে সাধারণ মানুষ পৌঁছাতে পারেনা বা পৌঁছানো অসম্ভব | তেমনই একটি কক্ষের সন্ধান কবি কবিতাটির শেষে দিয়েছেন | পরের পর্বে আমরা তারই আলোচনা করবো | ক্রমশ :

Facebook-এ প্রকাশ · ২৫ এপ্রিল, ২০২২2022-04-25