প্রবন্ধ
রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা অন্তিম পর্ব
Shyamal Samanta-: রবীন্দ্রকাব্যে আধ্যাত্মিকতা :- ( অন্তিম পর্ব ) ( লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) ( পর্যায় - প্রেম ) রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গানে আধ্যাত্মিকতার রসে নিমজ্জিত হয়ে প্রেমরসে সিক্ত হতে গেলে যে একটু উচ্চ পর্যায়ের ডুবুরি হতে হবে সে কথা অনস্বীকার্য । প্রেম পর্যায়ের কিছু কিছু গান আছে যেগুলো সমান ভাবে যতখানি পার্থিব প্রেমের হাতছানি দেয়, ঠিক ততোখানিই আধ্যাত্মিভাবে অনন্তের আভাসে আলোকিত হয় । তেমনই একখানা গান - বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে আমার নিভৃত নবজীবন পরে । প্রভাতকমলসম ফুটিল হৃদয় মম কার দুটি নিরুপম চরণ তরে ॥ জেগে ওঠে সব শোভা সব মাধুরী , পলকে পলকে হিয়া পুলকে পুরি । কোথা হতে সমীরণ আনে নব জাগরণ পরাণের আবরণ মোচন করে ॥ লাগে বুকে সুখে দুখে কত যে ব্যথা , কেমনে বুঝায়ে কব না জানি কথা । আমার বাসনা আজি ত্রিভুবনে উঠে বাজি , কাঁপে নদী বনরাজি বেদনাভরে ॥ এই গানটির অর্থ বোঝানো আমার উদ্দেশ্য নয় । শ্রোতা বা প্রেমিক প্রেমিকারা যে যেভাবে গানটিকে নেবে তার কাছে সেটা সেই ভাবেই প্রতিভাত হবে । গানটির মধ্যে প্রেমের মিলন-বিরহ, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুখ, প্রকাশ-অপ্রকাশ সমস্ত কিছুই বর্তমান । কৈশর প্রেমের কোলাহলে সমস্ত প্রেমিক প্রেমিকার মনেই যে প্রেমের বীণা বাজে সেটা আমরা সবাই জানি । জীবনের শুরুতে পার্থিব প্রেমের গন্ধে আমরা সবাই গুনগুনিয়ে উঠি " বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে, আমার নিভৃত নবজীবন পরে "। আমাদের উদ্দেশ্য পার্থিব প্রেমের গণ্ডী থেকে কি ভাবে আমাদের আধ্যাত্মিক প্রেমের উত্তরণ হবে । সেটাই রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গানের মধ্য থেকে আমরা বোঝার চেষ্টা করবো । কিন্তু প্রেম কি, ঈশ্বর প্রেমের অনুভুতিই বা কি, সেটাই আমরা বোঝার চেষ্টা করবো । অনন্ত ব্রহ্ম বাক্য ও মনের অতীত - তাকে আমরা ধরবো কেমনে ? তাইতো আমরা প্রেমের সহায় লই । প্রকৃতির সৌন্দর্যে প্রেম খুঁজি, কর্মের মধ্যে কর্ত্তব্যের মধ্যে প্রেম খুঁজি, সমস্ত জীবের মধ্যে প্রেম খুঁজি, সুর-তাল-লয় ও গানের মধ্যে প্রেম খুঁজি । সমস্ত কিছুর মধ্যে প্রেম খুঁজতে খুঁজতে আমরা একদিন ব্যক্তি স্বার্থ হতে উত্তীর্ণ হয়ে বৃহত্তর স্বার্থের দিকে অগ্রসর হই । আমরা বুঝতে পারি প্রেম কখনও নর-নারীর ব্যক্তিগত শারীরিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না । ভালোলাগা চোখের নেশা, আর ভালোবাসা একটা সর্বব্যাপী অখণ্ড আনন্দ সত্তার উপলব্ধি । আর তখনই আমাদের মন পার্থিব বস্তুর প্রেমের স্তর হতে অপার্থিব বস্তুর প্রেমের আহ্বান শুনতে পায় অর্থাৎ সেই পরম পুরুষের আভাস পায় । তখন আমরা আমাদের নূতন প্রেমের অনুভুতি নিয়ে বুঝতে পারি বা শুনতে পাই - " বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে , আমার নিভৃত নবজীবন পরে । " রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে গুপ্তধনের মতো একটা সূক্ষ্ম ভাব আছে যেটা তার নিজস্ব চিন্তার আবরণে ঢাকা । আমরা যদি আমাদের চিন্তার মাধ্যমে সেই আবরণটা ভেদ করতে পারি, তাহলে দেখবো তার প্রতিটি গানের মধ্য দিয়েই আনন্দের বহিপ্রকাশ । "প্রভাতকমলসম ফুটিল হৃদয় মম কার দুটি নিরুপম চরণ তরে " প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা তাহাদের অন্তর উদ্ভুত প্রেম রুপ কমল পরস্পর পরস্পরের পায়ে অর্পন করিতেই পারে , কিন্তু কবির ভাষায় ইহা পার্থিব না হইয়া অপার্থিব বা ঐশ্বরিক রুপে ফুটিয়া উঠিয়াছে। এখানে আমাদের কবি জয়দেবের 'গীতগোবিন্দ' থেকে ' দেহি পদপল্লব মুদারম' এর কথা মনে পড়ে যায় না কি ? যাহা রাধা কৃষ্ণের প্রেম কাব্য হিসাবে খ্যাত। রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গানের সিড়ি বেয়ে যে পার্থিব প্রেম হতে অপর্থিব বা ঐশ্বরিক প্রেমের পথে পাড়ি দেওয়া যায় সেটা আমাদের অনুভব বা অনুভুতি সাপেক্ষ । বিজ্ঞান-ব্রহ্মবাদে আস্বাদনের কথা আসিতেই পারে না, কিন্তু রবীন্দ্র-ব্রহ্মবাদের সকল ব্যাখ্যাতেই আস্বাদনের আনন্দ অনুভব বা উপলব্ধি করা যায় । আমাদের পক্ষে ইহা কি সর্বপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময বিষয় নয় ?