মূল পাতায় যান
খোলা বইয়ে ফিরুন

প্রবন্ধ

আমার জীবনে ঈশ্বর অনুভুতি পর্ব ৩

Shyamal Samanta

-:- আমার জীবনে ঈশ্বর অনুভুতি -:- ( পর্ব - ৩ ) ( লেখায় - শ্যামল সামন্ত ) ছোটবেলায় আমি যখন প্রাইমারী লেভেলে পড়তাম তখন মা আমাকে শ্রুতি লিখন practice করাতো অর্থাৎ মা আমাকে বই থেকে এক একটা বাক্য ভেঙ্গে ভেঙ্গে বলতো আর আমাকে শুনে শুনে তা স্লেটে পেনসিল দিয়ে লিখতে হতো । এতে করে শব্দের বানন শুদ্ধতা ও মনযোগের পরীক্ষা নিতো মা । মা রামায়নের কাহিনী গুলো ছোট ছোট গল্পের আকারে শোনাতো, মহাভারতের কাহিনী থেকে এমন কি উপনিষদের কিছু কিছু ঘটনা গল্পের আকারে শুনাতো । তেমন কিছু কিছু ঘটনা বা গল্প আমার এখনও মনে আছে, যেগুলো আমার মনে ভীষণ দাগ কেটেছিলো । ( ১ম গল্প ) - একদা এক বিধবা ব্রাহ্মন ভদ্রমহিলা তার একটি বালক সন্তানকে লইয়া বাস করিতেন । বালকটিকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে গুরু গৃহে যাইতে হইতো । একদিন বালকটি তার মা-কে বলিল, মা আমার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে বড় ভয় করে । এই কথা শুনে মা বললেন, যখনই ভয় করবে তখন তুমি তোমার মধুসূদন দাদাকে ডাকবে, তাহলে আর ভয় লাগবেনা । বালক মা কে কহিল, মা মধুসূদন দাদা কোথায় থাকে ? মা কহিলেন তিঁনি জঙ্গলেই থাকেন । বালক কহিল - মা তিঁনি আমার সাথে খেলা করবেন ? মা কহিল - হাঁ অবশ্যই করবে, যদি তুমি তাঁকে মন দিয়ে ডাকো । পরের দিন জঙ্গলের পথে ভয় পেয়ে মধুসূদন দাদাকে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো, অগত্যা মধুসূদন দাদা না আসায় কাঁদিতে লাগিল এবং কহিতে লাগিল, মা যে বলেছিল তুমি জঙ্গলেই থাকো , তাহলে তুমি আসছোনা কেন ? অবশেষে মধুসূদন দাদা বালকের রুপ ধরে তাকে দেখা দেয় এবং পাঠশালা পর্যন্ত আগায়ে দেয় এবং পড়া শেষে আবার বাড়ী পর্যন্ত ছেড়ে দেয় ।এই ভাবেই চলতে থাকে। মা ও ছেলের কথা কিছুই জানে না । মা মনে করেছিলো মধুসূদন দাদার কথাতে ওর ভয় কেটে গেছে । হঠাৎ একদিন পাঠশালার গুরুজীর বাবা মারা যান । গুরুজী সমস্ত শিষ্যদের বললেন - আমার বাবার শ্রদ্ধা-কার্যের জন্য তোমাদের এক একজনকে এক একটি ভার লইতে হইবে। তোমরা কে কি ভার নেবে আগামীকাল আমাকে জানিয়ে দেবে । এ কথা শুনে ঘরে এসেই মা কে বলিল - গুরুজীর আদেশের কথা । গরীব ব্রাহ্মণী কোনও কুল না পাইয়া অগত্যা বলিলেন - তুই তোর মধুসূদন দাদাকেই বলিস, তিঁনি ঠিক একটা উপায় বলে দেবেন । ছেলে একদম নিশ্চিন্ত । পরের দিন বালক মধুসূদন দাদাকে বলায় মধুসূদন দাদা বলিলেন, তুমি তোমার গুরুজীকে বোলো - গুরুজী , আমি আপনার পিতার কার্যে যত দৈ লাগে দেবো । সেই মতো বালক গুরুজীকে দৈএর ভার নেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত করিল । অতঃপর গুরুজীর পিতার শ্রাদ্ধের দিন আগত । সকল শিষ্যগণ নিজ-নিজ দায়িত্ব অনুসারে সমস্ত কিছু পাঠাইয়া দিয়েছেন একমাত্র বিধবা ব্রাহ্মণীর পুত্র ছাড়া । নিমন্ত্রিতদের ভোজনের সমস্ত কিছু প্রস্তুত কিন্তু শুধুমাত্র দৈ এর জন্য ভোজন বিলম্বিত হইতেছে । গুরু মহাশয় ক্রোধে অগ্নিশর্মা হইয়া ব্রাহ্মণী পুত্রের মুণ্ডপাত করিতেছেন । এদিকে ব্রাহ্মণী পুত্র তার মধুসূদন দাদার সঙ্গে খেলতে খেলতে মধুসূদন দাদাকে গুরু মহাশয়ের বাড়িতে দৈ নিয়ে যাওয়ার কথা বলিলে, তিঁনি বলিলেন - তুমি ঠিক সময়েই দৈ নিয়ে পৌঁছাইবে, এই বলিয়া মধুসূদন দাদা তাকে একটি ছোট মাটির ভাঁড়ে এক ভাঁড় দৈ দিয়ে বললেন, তুমি এটা নিয়ে যাও । আরও বলিলেন, যদি গুরু মহাশয় কিছু বলেন , তবে তাকে বলবে - এতেই সব কাজ মিটে যাবে । এ কথা শুনিয়া বালক মনের আনন্দে গুরু মহাশয়ের বাড়িতে পৌঁছালেন । সেখানে লোকে লোকারণ্য, গুরু মহাশয় তাকে দেখে বললেন, এসেছিস বাবা , তা তোর দৈ কোথায় ? এই কথা শুনিয়া, বালক গুরুজীকে দৈ পূর্ণ ছোট মাটির ভাঁড়টি দিলেন । গুরুজী ছোট মাটির ভাঁড়টি দেখিয়া নিজ ক্রোধ সম্বরণ করিতে পারিলেননা এবং বলিলেন, তুই আমার সাথে রসিকতা করিতেছিস - এই বলিয়া পা দিয়ে দৈ এর ভাঁড়টি উল্টাইয়া দিলেন । কিন্তু এ কি হইলো, দৈ এর ভাঁড় হইতে দৈ শেষ হইতেছে না, ক্রমে ক্রমে সমস্ত কর্মস্থল দৈ এ পরিপূর্ণ হইল , কিন্তু ভাঁড় হইতে দৈ শেষ হইল না । অবশেষে গুরুজী শিষ্যকে কোলে তুলে নিয়ে কহিল, বাবা এ দৈ তুই কোথায় পেয়েছিস ? শিষ্য কহিল, আমার মধুসূদন দাদা দিয়েছেন । গুরুজী - কোথায় থাকে তোর মধুসূদন দাদা ? শিষ্য - ঐ জঙ্গলে । গুরুজী - আমাকে দেখাতে পারবি, তোর মধুসূদন দাদাকে ? শিষ্য - হাঁ । গুরুজী শিষ্যকে কোলে লইয়া এবং উপস্থিত সকলে জঙ্গলের দিকে চলিলেন । জঙ্গলে উপস্থিত হইয়া শিষ্য মধুসূদন দাদা, মধুসূদন দাদা বলিয়া চিৎকার করিতে লাগিল এবং অবশেষে কাঁদিতে লাগিল , কিন্তু মধুসূদন দাদা আসিল না । উপর হইতে মধুসূদন দাদার কন্ঠস্বর ভেসে আসলো - তুমি সরল বিশ্বাসে আমাকে ডেকেছিলে, তাই তোমাকে দেখা দিয়েছিলাম, তোমার সাথে যারা আছে তাদের সেই সরল বিশ্বাস নেই - তুমি যখন একা থাকবে আমি আবার তোমার কাছে আসবো, তোমার সাথে খেলা করবো । মা এর বলা গল্পটা সেই কোন ছোট-বেলায় শোনা । সকলেই বলতে পারো এ আর এমন কি গল্প, কিন্তু আমি আমার ছোটবেলায় বিশ্বাস কি জিনিষ সেটা অনুভব করতে শিখেছিলাম । এ বিশ্বাস সত্যের উপর বিশ্বাস, ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস ,গুরুর উপর বিশ্বাস সর্বোপরি নিজের উপর বিশ্বাস । -:- -:- -:- ( ক্রমশঃ )

Facebook-এ প্রকাশ · ২৪ জুলাই, ২০২৪2024-07-24